মিকি মাউসের স্রষ্টার একজন সফল ব্যবসায়ী হয়ে উঠা

সর্বশেষ হালনাগাদঃ ২ জুন ২০১৮

 

‘এমন যদি হত, আমি পাখির মত, উড়ে উড়ে বেড়াই সারাক্ষণ’ সত্যিই আমাদের দেশটা যদি স্বপ্নপুরী হত তাহলে কেমন হত? আমাদের সবারই ছোটবেলার কিছু স্মৃতি, কিছু টিভি শো রয়েছে যেগুলো আমাদের আবেগকে এখনও নাড়া দেয়। ছোটবেলায় গুরুজনদের কাছ থেকে অনেক গল্প শুনতাম, মিকি মাউস, স্নো হোয়াইট, পিনকিও, বেউটি অ্যান্ড দ্যা বিস্ট, আলাদীনের চেরাগ, সিনড্রেলা, আরও কত কিছু তাই না? আমার এখনও মনে আছে স্কুল থেকে এসেই সাদাকালো টিভিতে মিকি মাউস দেখতে বসতাম। স্নো হোয়াইট দেখলে মনে হত, ইসস! আমার যদি এমন স্বপ্নপুরী রাজ্য থাকতো!! পিনকিও দেখতে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য লাগতো। রাতে একটা পরী এসে কাঠের পুতুলকে মানুষ বানিয়ে দিত, সত্যিই কি এমন হয়! দিন রাত ভাবতাম। দিনগুলো যেন স্বপ্ন দেখেই পার করে দিতামকিন্তু কখনো কি ভেবেছি আমাদের সামনে এত মজার মজার কার্টুন, স্বপ্ন রাজ্যের গল্প, অ্যানিমেশন আমাদের কাছে কে নিয়ে এসেছে? আমরা সবাই ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড-এর কথা নিশ্চয়ই শুনেছি। টিভিতে অনেক বিজ্ঞাপনও দেখি। এটি একটি পার্ক, যেখানে ছোটছোট ছেলেমেয়েদের জন্য ডিজনির তৈরি সব অ্যানিমেশনের রাজকুমার, রাজকুমারী, মিকি মাউস, পিনকিও ইত্যাদিকে রাখা হয়েছে এবং বিনোদনের জন্য আরও কিছু রাইডের ব্যবস্থা আছে।  

ওয়াল্ট ডিজনি যদি এসব না নিয়ে আসত তাহলে আমাদের ছোটবেলা হয়ত এত রঙিন হত না। নিশ্চয়ই আপনার মনে একটি প্রশ্ন এসেছে- ওয়াল্ট ডিজনি কে? তিনি ছিলেন একজন অ্যানিমেটর এবং মিকি মাউসের কার্টুনটি তিনিই তৈরি করেছিলেন। ওয়াল্ট ডিজনি শিকাগো-তে ১৯০১ সালে জন্মগ্রহন করেন। স্বপ্নের রাজ্য ডিজনিল্যান্ড এবং ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড-এর প্রতিষ্ঠাতাও তিনিডিজনি এবং তার ভাই রয় ‘ওয়াল্ট ডিজনি প্রোডাকশন’ নামের কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন। এইতো ২০১৩ সালের ‘ফ্রোজেন(Frozen)’, ২০১৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘মোয়ানা(moana)’ অ্যানিমেশনটিও কিন্তু ডিজনি কোম্পানির। ডিজনি তার জীবনে ২২টি একাডেমিক পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ছিলেন একজন উদ্যোক্তা, টেলিভিশনের জনপ্রিয় ব্যক্তি এবং অস্কার বিজয়ী।

তিনি কীভাবে এত জনপ্রিয় হলেন? 

১৯১৯ সালে ডিজনি যখন পত্রিকায় আর্টিস্ট হওয়ার জন্য ক্যানসাস শহরে আসেন তখন তার ভাই রয় তাকে পেশমান-রুবিন আর্ট স্টুডিওতে চাকরি দেন। সেখানে তিনি অ্যানিমেশনের সাহায্যে একটি ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন তৈরি করেন ঠিক তখনই তার তার মাথায় নিজের অ্যানিমেশন কোম্পানি খোলার ধারণাটি আসে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ! একজন দক্ষ আর্টিস্টের কাছে এটি তেমন কঠিন কাজও ছিল না।  ক্যানসাস-এ ভাড়া করা ‘লাফ-ও-গ্রাম(Laugh-O-Gram)’ নামক থিয়েটারে তার তৈরি করা কার্টুনগুলো দেখাতেন। এখানে কিছু কর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন। তাদেরকে দিয়ে কার্টুনগুলোর সরাসরি অভিনয়ও করাতেন। তখনকার সময়ে এটি অনেক জনপ্রিয় হয়েছিল। তারপর ১৯২০ সালে ‘এলাইস ইন কার্টুনল্যান্ড(Alice in Cartoonland)’ নামে ৭ মিনিটের একটি অ্যানিমেশন তৈরি করেন। এই প্রোজেক্টটি তৈরি ও উপস্থাপনা করার জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন না থাকায় ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়। কার্টুনটি জনপ্রিয় হলেও ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী ডিজনি ও তার কর্মচারীরা মুনাফা লাভ করতে পারেনি বলে ব্যাংক তাকে দেউলিয়া ঘোষণা করে। ১৯২৩ সালে ডিজনি তার পিতা-মাতা এবং তার ভাইয়ের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে একটি নতুন কোম্পানী গঠন করেন মিকি মাউস তৈরির পর  ওয়াল্ট ডিজনি আবারও দেউলিয়া হয়ে যানএত ব্যর্থতার পরও নিজেকে সামলে রাখা কঠিন ব্যাপার ছিল!! কিন্তু এত কিছুর পরও তিনি থেমে থাকেন নি।

তার ভাবনা ছিল অতুলনীয়। ছোট ছোট বিষয়গুলো তিনি এমনভাবে  আকর্ষণীয় করে তুলে ধরতেন একবার দেখে যেন মন ভরে না‘এলাইস ইন কার্টুনল্যান্ড’ এর উপর ভিত্তি করে ১৯৫১ সালে এবং পুনরায় ২০১০ সালে ‘এলাইস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’ নামে যে হলিউড মুভি বের হয়েছিল তা আমরা অনেকেই দেখেছি। যদি মুভিটি না দেখে থাকেন তবে এখুনি দেখে নিন। মুভিটা যতবার দেখবেন ততবারই অসাধারণ লাগবেএটা খুবই দুঃখজনক যখন আপনার লেখা অন্য কেউ চুরি করে নিজের নামে প্রচার করে। হ্যা, ডিজনির সাথেও তাই ঘটেছিল। তিনি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অসওয়াল্ড দ্যা লাকি র‍্যাবিট’ নামে যে অ্যানিমেশন বের করেছিলেন তা নিজের নামে ছিল না কারন তা চুরি হয়ে গিয়েছিল। তাই কপিরাইট হিসেবে তার ডিস্ট্রিবিউটরের নামে বের করেছিলেন। ডিজনির জন্য এটা ভুল কাজ ছিল তাই তিনি চিন্তা করলেন কি করা যায়! তিনি যেই অফিসে কাজ করতেন সেখানে অনেক ইঁদুর ছিল। তখনই তার মাথায় মিকি মাউস কার্টুনের জন্য ধারণাটি আসে। ডিজনি বলেছেন- “আমি যখন গভীর রাতে কাজ করতাম ইঁদুররা আমার ময়লার ঝুড়িতে একত্রিত হত। তাদের মধ্যে একজন ছিল আমার বন্ধু”

ডিজনির সত্যিকারের সাফল্য আসে ১৯২৮ সালে ‘স্টীমবোট উইলি’ কার্টুনটি বের করার মাধ্যমে। ডিজনি স্টুডিও এরই মধ্যে অনেক জনপ্রিয়তা লাভ করে১৯২৯ সালে ডিজনি মিকি মাউস কার্টুনটি নতুন রুপে ‘মিকি মাউস ক্লাবহাউস’ নামে এবং সাথে কিছু নতুন বন্ধু- মিনি মাউস, ডোনাল্ড ডাক, গোফি এবং প্লুটোকে নিয়ে আসে। এইবার তিনি আগের ভুলগুলো শুধরে নেয়ায় অনেক মুনাফা পান১৯৩৭ সালে ‘স্নো হোয়াইট এবং সেভেন ডার্ফস’ নামে দীর্ঘ সময়ের একটি অ্যানিমেশন বের করেন যা ৩ বছর ধরে মুনাফার উৎস ছিল। এর পরপরই পিনকিও(১৯৪০), ফ্যান্টাসিয়া(১৯৪০), ডাম্বও(১৯৪১), বাম্বি(১৯৪২), ট্রেজার আইল্যান্ড(১৯৫০), সিন্ড্রেলা(১৯৫০), পিটার পেন(১৯৫৩), স্লিপিং বিউটি(১৯৫৯) তৈরি করেন।  তিনি জীবিত অবস্থায় ১০০টিরও বেশি কার্টুন এবং অ্যানিমেশন তৈরি করে গিয়েছেন  

ডিজনিল্যান্ড ও ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড

ডিজনি অনেক সৌখিন ছিলেনতিনি প্রায় স্বপ্ন দেখতেন একটা বিনোদন পার্কের যেখানে ছেলেমেয়েরা আসবে উপভোগ করবে। বিষয়টা সত্যিই অনেক মজার! কিন্তু তখন স্বপ্নটা পূরণ করার জন্য তার কাছে যথেষ্ট টাকা ছিল না। অবশেষে ১৯৫৫ সালে ১৮৫ একর জমিতে ডিজনিল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করেনযা এখন পুরো বিশ্বে একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র এবং এটিকে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে আনন্দময় জায়গা বলা হয়। পার্কটি প্রতিষ্ঠার পর ১৯৬০ সালের প্রথম দিকে, এটি বিভিন্ন পরিবারের বিনোদন পার্ক হওয়ায় এবং বড়দের বিনোদনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেকের মাঝে অসন্তুষ্টি তৈরি করছিলোতাই ডিজনি ১৯৬০ সালে অরল্যান্ডোতে ২৭,০০০ একরের জমিতে ‘ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড’ নামে আরেকটি বিনোদনের সম্রাজ্য তৈরি করেন এখানে তিনি সবধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা করেন যা ডিজনিল্যান্ডে করতে পারেননি। এসকল স্বপ্ন পূরণ করেও যেন শেষ করতে পারলেন না। ৬৫ বছর বয়সে ১৯৬৬ সালে তিনি মারা যান।

তার সাফল্যের কারণ কী?

ওয়াল্ট ডিজনি একজন কার্টুন আর্টিস্ট ও অ্যানিমেটর ছিলেন তাই তার সাফল্যের প্রথম কারণ অবশ্যই তার দক্ষতা ও সৃজনশীলতাএছাড়াও তার ঝুঁকি গ্রহনের মনোভাব, ধৈর্য ধারণ ক্ষমতা, স্বপ্নপূরণের চেষ্টা, শেখার আগ্রহ, গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা তাকে সাফল্যের পথে ধাপে ধাপে এগিয়ে নিয়েছেডিজনি যখন লাফ-ও-গ্রাম থিয়েটার পরিচালনা করতেন ঋণ পরিশোধ না করতে পারায় দেউলিয়া হন এমনকি মিকি মাউস বের করার পর আবারও একই অবস্থা হয়। তবুও তিনি মিডিয়া জগৎ থেকে সরে যাননি। ধৈর্য সহকারে আবারও ‘স্টীমবোট উইলি’ কার্টুন ও ‘স্নো হোয়াইট এবং সেভেন ডার্ফস’ নামে অ্যানিমেশনটি তৈরি করে মুনাফা লাভ করেন। তার প্রথম অ্যানিমেশন ‘অসওয়াল্ড দ্যা লাকি র‍্যাবিট’ নিজের নামে প্রকাশ না করে ডিস্ট্রিবিউটরের নামে কপিরাইট হিসেবে প্রকাশ করতে হয়েছিল। তার অসাবধানতার কারনে যে ক্ষতি হয়েছে তা থেকে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন। ডিজনি গভীরভাবে চিন্তা করতেন, তার প্রমান মিকি মাউস কার্টুনটি। অফিসের ঝুড়িতে ইঁদুর দেখে তিনি মিকি মাউসের চরিত্রটি উদ্ভাবন করেন। কোনকিছু নিয়ে গভীরভাবে ও অবাস্তবিক চিন্তা না করলে এমন ধারণা মাথায় আসা সম্ভব না। ডিজনির আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার ক্ষমতাও ছিল। তার অ্যানিমেশন ও কার্টুনগুলো খুব ড্রামাটিকভাবে উপস্থাপন করতেন। এগুলো দর্শকদের জন্য আকর্ষণীয় ও স্বপ্নময় হত তাই বারবার ডিজনির কার্টুন ও অ্যানিমেশনগুলো দেখতে আসতেন। ডিজনি যা স্বপ্ন দেখেছেন তা পূরণের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। ডিজনিল্যান্ড ও ওয়াল্ট ডিজনি ওয়ার্ল্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করেছেন। অস্কার প্রাপ্ত ডিজনি আরও অনেক গুণাবলীর অধিকারী ছিলেন যা হয়ত বলে শেষ করা যাবে না।

একজন উদ্যোক্তা হিসেবে ডিজনিকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। কিন্তু সেসব বাধাকে জয় করার দুর্দমনীয় মানসিকতাই তাকে সাফল্যের চূড়ায় নিয়ে গিয়েছে।